শেয়ার কত প্রকার ও কী কী?
একটি কোম্পানি তার মূলধন সংগ্রহ এবং বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন শ্রেণির শেয়ার ইস্যু করতে পারে। শেয়ারের অধিকার, লভ্যাংশ পাওয়ার সুযোগ, মূলধন ফেরতের অগ্রাধিকার এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে শেয়ারকে বিভিন্ন ভাগে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়।
শেয়ারবাজারে লেনদেনের দিক থেকে শেয়ারকে সাধারণভাবে প্রাথমিক বাজার (Primary Market) এবং দ্বিতীয়িক বাজার (Secondary Market)—এই দুই পর্যায়ে দেখা যায়।
প্রাথমিক ও দ্বিতীয়িক শেয়ার
১. প্রাথমিক বাজারের শেয়ার (Primary Share)
কোনো কোম্পানি যখন প্রথমবার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার অফার করে এবং শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য Initial Public Offering (IPO) করে, তখন সেটি প্রাথমিক বাজারের শেয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়।
IPO-এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির কাছ থেকে সরাসরি শেয়ার কেনার সুযোগ পান। শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ কোম্পানি ব্যবসা সম্প্রসারণ, ঋণ পরিশোধ বা অন্যান্য নির্ধারিত কাজে ব্যবহার করতে পারে।
২. দ্বিতীয়িক বাজারের শেয়ার (Secondary Share)
IPO-এর মাধ্যমে শেয়ার ইস্যু হওয়ার পর যখন সেই শেয়ার স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ক্রয়-বিক্রয় হয়, তখন তা দ্বিতীয়িক বাজারের অংশ হয়ে যায়।
দ্বিতীয়িক বাজারে বিনিয়োগকারীরা একে অপরের কাছ থেকে শেয়ার ক্রয় ও বিক্রয় করতে পারেন। বাংলাদেশে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (CSE)-এর মাধ্যমে তালিকাভুক্ত শেয়ারের লেনদেন হয়।
শেয়ারের প্রধান প্রকারভেদ
শেয়ারের বৈশিষ্ট্য ও অধিকার অনুযায়ী প্রধানত দুই ধরনের শেয়ার হলো—
- সাধারণ শেয়ার (Ordinary/Equity Share)
- অগ্রাধিকার শেয়ার (Preference Share)
১. সাধারণ শেয়ার (Ordinary/Equity Share)
সাধারণ শেয়ার হলো এমন শেয়ার, যার মালিকরা কোম্পানির মালিকানায় অংশীদারিত্ব লাভ করেন। সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা সাধারণত কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে ভোট দেওয়ার অধিকার রাখেন এবং কোম্পানি মুনাফা করলে ঘোষিত লভ্যাংশ পাওয়ার সুযোগ পান।
তবে অগ্রাধিকার শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ ও মূলধন ফেরতের দাবি পূরণের পর সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের দাবি পূরণ করা হয়। কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেলে বা অবসায়িত হলে মূলধন ফেরতের ক্ষেত্রেও সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা অগ্রাধিকার পান না।
২. অগ্রাধিকার শেয়ার (Preference Share)
যে শেয়ারের মালিকরা সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের তুলনায় লভ্যাংশ পাওয়া এবং কোম্পানি বিলুপ্ত হলে মূলধন ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পেয়ে থাকেন, তাকে অগ্রাধিকার শেয়ার বা Preference Share বলা হয়।
অগ্রাধিকার শেয়ারকে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়।
ক. সঞ্চয়ী অগ্রাধিকার শেয়ার (Cumulative Preference Share)
এই ধরনের শেয়ারে কোনো বছরে কোম্পানি নির্ধারিত লভ্যাংশ দিতে না পারলে সেই বকেয়া লভ্যাংশ পরবর্তী লাভজনক বছরে জমা হয়ে যায়। পরবর্তীতে কোম্পানি লাভ করলে আগের বকেয়া লভ্যাংশসহ বর্তমান বছরের লভ্যাংশ পরিশোধ করা হয়।
খ. অসঞ্চয়ী অগ্রাধিকার শেয়ার (Non-Cumulative Preference Share)
এই ধরনের শেয়ারে কোনো নির্দিষ্ট বছরে কোম্পানি লভ্যাংশ দিতে না পারলে সেই বছরের লভ্যাংশ পরবর্তী বছরে বকেয়া হিসেবে জমা হয় না। অর্থাৎ, যে বছরের লভ্যাংশ পাওয়া যায়নি, পরবর্তীতে সেটি দাবি করার সুযোগ থাকে না।
গ. অংশগ্রহণমূলক অগ্রাধিকার শেয়ার (Participating Preference Share)
যে অগ্রাধিকার শেয়ারে নির্ধারিত হারে লভ্যাংশ পাওয়ার পাশাপাশি নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে অতিরিক্ত লভ্যাংশ পাওয়ার সুযোগ থাকে, তাকে অংশগ্রহণমূলক অগ্রাধিকার শেয়ার বলা হয়।
ঘ. অনংশগ্রহণমূলক অগ্রাধিকার শেয়ার (Non-Participating Preference Share)
এই ধরনের শেয়ারহোল্ডাররা নির্ধারিত হারে লভ্যাংশ পান। তবে কোম্পানি অতিরিক্ত মুনাফা করলে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের সঙ্গে অতিরিক্ত লভ্যাংশে অংশগ্রহণের অধিকার সাধারণত থাকে না।
ঙ. পরিশোধ্য অগ্রাধিকার শেয়ার (Redeemable Preference Share)
যে অগ্রাধিকার শেয়ার নির্দিষ্ট সময় বা নির্ধারিত শর্ত পূরণের পর কোম্পানি পুনরায় কিনে বা পরিশোধ করে নিতে পারে, তাকে পরিশোধ্য অগ্রাধিকার শেয়ার বলা হয়।
চ. অপরিশোধ্য অগ্রাধিকার শেয়ার (Non-Redeemable Preference Share)
যে অগ্রাধিকার শেয়ারের মূলধন নির্ধারিত সময়ে কোম্পানি ফেরত দেয় না এবং সাধারণত কোম্পানির বিলুপ্তি বা নির্ধারিত পরিস্থিতি পর্যন্ত বহাল থাকে, তাকে অপরিশোধ্য অগ্রাধিকার শেয়ার বলা হয়।
ছ. পরিবর্তনযোগ্য অগ্রাধিকার শেয়ার (Convertible Preference Share)
যে অগ্রাধিকার শেয়ার নির্দিষ্ট শর্ত ও সময় অনুযায়ী সাধারণ বা ইকুইটি শেয়ারে রূপান্তর করার সুযোগ থাকে, তাকে পরিবর্তনযোগ্য অগ্রাধিকার শেয়ার বলা হয়।
জ. অপরিবর্তনযোগ্য অগ্রাধিকার শেয়ার (Non-Convertible Preference Share)
যে অগ্রাধিকার শেয়ারকে সাধারণ বা ইকুইটি শেয়ারে রূপান্তর করার সুযোগ নেই, তাকে অপরিবর্তনযোগ্য অগ্রাধিকার শেয়ার বলা হয়।
অন্যান্য ধরনের শেয়ার
সাধারণ ও অগ্রাধিকার শেয়ারের পাশাপাশি কোম্পানির মূলধন কাঠামো এবং শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার অনুযায়ী আরও কিছু বিশেষ ধরনের শেয়ার রয়েছে।
ক. বোনাস শেয়ার (Bonus Share)
কোম্পানি যখন নগদ লভ্যাংশের পরিবর্তে বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের বিনামূল্যে অতিরিক্ত শেয়ার প্রদান করে, তখন তাকে বোনাস শেয়ার বলা হয়।
বোনাস শেয়ার পাওয়ার জন্য শেয়ারহোল্ডারকে সাধারণত অতিরিক্ত নগদ অর্থ প্রদান করতে হয় না। এটি কোম্পানির বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে নির্দিষ্ট অনুপাতে বিতরণ করা হতে পারে।
খ. রাইট শেয়ার (Right Share)
কোম্পানি অতিরিক্ত মূলধন সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের নতুন শেয়ার কেনার বিশেষ অধিকার দিলে তাকে রাইট শেয়ার বলা হয়।
রাইট শেয়ারের ক্ষেত্রে বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডাররা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের তুলনায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নতুন শেয়ার কেনার সুযোগ পান। তবে রাইট শেয়ার ইস্যুর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইন, বিধিমালা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন প্রযোজ্য।
গ. অনাঙ্কিক মূল্যের শেয়ার (No-Par Value Share)
যে শেয়ারের নির্দিষ্ট অভিহিত মূল্য (Face Value) উল্লেখ করা থাকে না, তাকে অনাঙ্কিক মূল্যের শেয়ার বা No-Par Value Share বলা হয়।
এ ধরনের শেয়ারের মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি কোম্পানির আইনগত কাঠামো ও সংশ্লিষ্ট নিয়মের ওপর নির্ভর করে।
সংক্ষেপে
শেয়ারকে এর বৈশিষ্ট্য ও অধিকার অনুযায়ী বিভিন্নভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
- সাধারণ বা ইকুইটি শেয়ার
- অগ্রাধিকার শেয়ার
- সঞ্চয়ী অগ্রাধিকার শেয়ার
- অসঞ্চয়ী অগ্রাধিকার শেয়ার
- অংশগ্রহণমূলক অগ্রাধিকার শেয়ার
- অনংশগ্রহণমূলক অগ্রাধিকার শেয়ার
- পরিশোধ্য অগ্রাধিকার শেয়ার
- অপরিশোধ্য অগ্রাধিকার শেয়ার
- পরিবর্তনযোগ্য অগ্রাধিকার শেয়ার
- অপরিবর্তনযোগ্য অগ্রাধিকার শেয়ার
- বোনাস শেয়ার
- রাইট শেয়ার
- অনাঙ্কিক মূল্যের শেয়ার
তবে প্রাথমিক বাজার (IPO) ও দ্বিতীয়িক বাজার (Secondary Market) শেয়ারের আলাদা প্রকার নয়; এগুলো মূলত শেয়ার ইস্যু ও লেনদেনের দুটি পর্যায়। এই পার্থক্যটি বোঝা শেয়ারবাজার সম্পর্কে সঠিক ধারণা তৈরির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
