শেয়ার ব্যবসায় লাভবান হওয়ার ১০টি মৌলিক কৌশল
শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে ভালো ফল পেতে হলে শুধু শেয়ারের দাম বাড়বে কি না, তা দেখলেই হয় না। একটি কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা, মুনাফা, মূল্যায়ন, লভ্যাংশ, ব্যবসার সম্ভাবনা এবং শেয়ারের তারল্যসহ বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
দেশি-বিদেশি শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন মতামত ও প্রচলিত বিনিয়োগ বিশ্লেষণের আলোকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিবেচনাযোগ্য কিছু মৌলিক কৌশল নিচে তুলে ধরা হলো। তবে কোনো কৌশলই শতভাগ নিশ্চিত মুনাফার নিশ্চয়তা দেয় না। বিশেষ করে স্বল্পমেয়াদে বাজারের ওঠানামার কারণে প্রত্যাশিত ফল নাও পাওয়া যেতে পারে। তাই বিনিয়োগের আগে নিজস্ব গবেষণা ও ঝুঁকি মূল্যায়ন করা গুরুত্বপূর্ণ।
১. শেয়ারের মূল্য-আয় অনুপাত (P/E Ratio)
P/E Ratio বা Price-to-Earnings Ratio একটি কোম্পানির শেয়ার বাজারদরের তুলনায় কোম্পানিটি কত আয় করছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপক।
সাধারণভাবে কম P/E Ratio-কে তুলনামূলকভাবে কম মূল্যায়নের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়। তবে শুধু P/E Ratio কম হলেই কোনো শেয়ার ভালো বা কম ঝুঁকিপূর্ণ—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। একই খাতের অন্যান্য কোম্পানির P/E Ratio এবং কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাও বিবেচনা করতে হবে।
অনেক বিনিয়োগকারী ২০-এর নিচে P/E Ratio-কে তুলনামূলক আকর্ষণীয় এবং ৪০-এর বেশি P/E Ratio-কে তুলনামূলক উচ্চ মূল্যায়ন হিসেবে বিবেচনা করেন। তবে এই সীমাগুলো কোনো সর্বজনীন নিয়ম নয়; খাত ও কোম্পানিভেদে গ্রহণযোগ্য P/E ভিন্ন হতে পারে।
২. শেয়ার প্রতি সম্পদ মূল্য (NAV)
NAV বা Net Asset Value হলো কোম্পানির নিট সম্পদের বিপরীতে প্রতি শেয়ারের আনুমানিক সম্পদমূল্য।
কোম্পানির বাজারমূল্য এবং NAV-এর মধ্যে সম্পর্ক বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণযোগ্য বিষয়। তবে শুধু বাজারমূল্য NAV-এর নিচে বা উপরে রয়েছে—এমন তথ্যের ভিত্তিতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
কোম্পানি অবসায়িত হলে সাধারণত প্রথমে ব্যাংক ঋণ ও অন্যান্য দায়-দেনা পরিশোধ করা হয়। এরপর সম্পদ বিক্রি করে কোনো অর্থ অবশিষ্ট থাকলে তা শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে বণ্টিত হতে পারে। তাই NAV বিশ্লেষণের পাশাপাশি কোম্পানির ঋণ, সম্পদের গুণগত মান এবং ব্যবসার সক্ষমতাও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
৩. শেয়ার প্রতি আয় (EPS)
EPS বা Earnings Per Share হলো কোম্পানির নিট মুনাফার বিপরীতে প্রতি শেয়ারের আয়।
সাধারণভাবে ধারাবাহিকভাবে ভালো ও ক্রমবর্ধমান EPS একটি কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতার ইতিবাচক ইঙ্গিত হতে পারে। EPS বেশি হলে কোম্পানির লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি হতে পারে। তবে বেশি EPS মানেই বেশি লভ্যাংশ নিশ্চিত—এমন নয়।
তাই শুধু একটি বছরের EPS না দেখে গত কয়েক বছরের EPS-এর প্রবৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যতে মুনাফা ধরে রাখার সক্ষমতা বিশ্লেষণ করা উচিত।
৪. শেয়ারের সংখ্যা ও তারল্য
কোম্পানির মোট শেয়ারের পাশাপাশি বাজারে প্রকৃতপক্ষে কত শেয়ার লেনদেনযোগ্য বা Free Float রয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সীমিত সংখ্যক লেনদেনযোগ্য শেয়ারের ক্ষেত্রে চাহিদা ও সরবরাহের পরিবর্তনে দামের ওঠানামা তুলনামূলক বেশি হতে পারে। অন্যদিকে বেশি Free Float থাকলে শেয়ারের বাজারে লেনদেনের সুযোগ বাড়তে পারে।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শেয়ারের তারল্য বা Liquidity-ও বিবেচনা করা জরুরি। নিয়মিত ও পর্যাপ্ত পরিমাণে লেনদেন হয় এমন শেয়ারে প্রয়োজনের সময় তুলনামূলক সহজে কেনাবেচা করা যায়। বিপরীতে কম লেনদেন হওয়া শেয়ারে জরুরি সময়ে কাঙ্ক্ষিত দামে শেয়ার বিক্রি করা কঠিন হতে পারে।
৫. অনুমোদিত মূলধন ও পরিশোধিত মূলধন
Authorized Capital এবং Paid-up Capital-এর অবস্থানও বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বিবেচ্য বিষয়।
কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন যদি অনুমোদিত মূলধনের কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে নতুন শেয়ার ইস্যু করতে কোম্পানিকে প্রথমে Authorized Capital বাড়াতে হতে পারে।
বিশেষ করে যারা Bonus Share বা Right Share-এর বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেন, তাদের কোম্পানির মূলধন কাঠামো ও ভবিষ্যৎ মূলধন বৃদ্ধির পরিকল্পনা সম্পর্কে ধারণা রাখা উচিত।
তবে শুধু Authorized Capital ও Paid-up Capital-এর অনুপাত দেখে কোনো কোম্পানিকে ভালো বা খারাপ হিসেবে মূল্যায়ন করা উচিত নয়।
৬. ডিভিডেন্ড ইল্ড (Dividend Yield)
Dividend Yield হলো কোনো শেয়ারের বর্তমান বাজারমূল্যের তুলনায় বিনিয়োগকারী কত শতাংশ নগদ লভ্যাংশ পাচ্ছেন তার একটি পরিমাপ।
সহজভাবে হিসাব করলে:
Dividend Yield = (প্রতি শেয়ারে লভ্যাংশ ÷ বর্তমান বাজারমূল্য) × ১০০
উদাহরণস্বরূপ, কোনো শেয়ারের বাজারমূল্য ১০০ টাকা এবং কোম্পানি প্রতি শেয়ারে ৫ টাকা নগদ লভ্যাংশ দিলে Dividend Yield হবে ৫%।
তাই শুধু ঘোষিত Dividend Rate না দেখে বর্তমান বাজারমূল্যের তুলনায় প্রকৃত Dividend Yield কত, সেটিও দেখা গুরুত্বপূর্ণ।
৭. ডিভিডেন্ডের ধারাবাহিকতা বা ট্র্যাক রেকর্ড
কোম্পানিটি গত ৩–৫ বছরে নিয়মিত কী পরিমাণ লভ্যাংশ দিয়েছে, তা বিশ্লেষণ করুন।
শুধু কোনো একটি বছরে বেশি লভ্যাংশ দিয়েছে কি না, সেটি না দেখে দীর্ঘমেয়াদে কোম্পানির Dividend Track Record, মুনাফা এবং নগদ প্রবাহের সঙ্গে লভ্যাংশের সামঞ্জস্য দেখুন।
নিয়মিত লভ্যাংশ প্রদানকারী এবং আর্থিকভাবে স্থিতিশীল কোম্পানি অনেক দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীর কাছে তুলনামূলক আকর্ষণীয় হতে পারে।
৮. মুনাফার ট্র্যাক রেকর্ড
কোম্পানির গত কয়েক বছরের মুনাফার ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গত ৩–৫ বছরে কোম্পানির Revenue, Operating Profit এবং Net Profit কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, তা দেখুন। কোনো বছরে মুনাফা হঠাৎ বেড়ে গেলে বা কমে গেলে তার কারণও খুঁজে বের করা প্রয়োজন।
একটি ভালো কোম্পানির ক্ষেত্রে শুধু বর্তমান মুনাফা নয়, ভবিষ্যতে সেই মুনাফা ধরে রাখা বা বাড়ানোর সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
৯. শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ
কোম্পানির শেয়ারহোল্ডিং কাঠামোও বিনিয়োগ বিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
উদ্যোক্তা ও পরিচালক, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ারহোল্ডিংয়ে সময়ের সঙ্গে কী ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে।
বিশেষ করে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ারহোল্ডিংয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলে তার কারণ খতিয়ে দেখা উচিত। তবে শুধু শেয়ারহোল্ডিং পরিবর্তনের ভিত্তিতে শেয়ারের ভবিষ্যৎ দাম বাড়বে বা কমবে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
১০. কোম্পানির সুনাম, ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসার সম্ভাবনা
শেয়ার কেনার আগে কোম্পানির ব্যবসার ধরন, সুনাম, কর্পোরেট গভর্ন্যান্স এবং ব্যবস্থাপনার দক্ষতা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া জরুরি।
একটি কোম্পানি ভবিষ্যতে কতটা ভালো করবে, ব্যবসা কতটা সম্প্রসারণ করতে পারবে এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে কতটা টিকে থাকতে পারবে—এসব অনেকাংশে নির্ভর করে কোম্পানির ব্যবসায়িক মডেল, ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, নেতৃত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর।
এ ছাড়া কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন, ঋণের পরিমাণ, নগদ প্রবাহ, সংশ্লিষ্ট পক্ষের লেনদেন এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কোম্পানির কর্পোরেট গভর্ন্যান্সের মানও বিবেচনা করা উচিত।
কেনার সময়ই ভালো বিনিয়োগের ভিত্তি তৈরি হয়
শেয়ারবাজারে একটি প্রচলিত ধারণা হলো—“লাভ শুধু বিক্রির সময় নয়, কেনার সময়ও তৈরি হয়।”
অর্থাৎ একটি ভালো কোম্পানির শেয়ারও যদি অতিরিক্ত বেশি দামে কেনা হয়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত রিটার্ন পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে। বিপরীতে ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ার যুক্তিসংগত মূল্যায়নে কেনার সুযোগ পাওয়া গেলে দীর্ঘমেয়াদে ভালো রিটার্নের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তাই শেয়ার কেনার আগে কোম্পানির P/E Ratio, EPS, NAV, Dividend Yield, মুনাফার ধারাবাহিকতা, লভ্যাংশের ইতিহাস, Free Float, তারল্য, শেয়ারহোল্ডিং কাঠামো এবং ব্যবসার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
শেয়ারবাজারে কোনো বিনিয়োগ কৌশলই নিশ্চিত মুনাফার নিশ্চয়তা দেয় না। বাজার পরিস্থিতি, অর্থনীতি, সুদের হার, কোম্পানির পারফরম্যান্স, শিল্পখাতের পরিবর্তন এবং অন্যান্য বিভিন্ন কারণে শেয়ারের মূল্য বাড়তে বা কমতে পারে।
শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ। জেনে, বুঝে ও নিজের ঝুঁকি গ্রহণক্ষমতা বিবেচনা করে বিনিয়োগ করুন।
